শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ০৯:১৩ অপরাহ্ন

সিলেটে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, ভয়াবহ অবস্থা সন্নিকটে

সিলেটে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে, ভয়াবহ অবস্থা সন্নিকটে

sylhetlive24.com/সিলেট লাইভ


বিশেষ প্রতিবেদক

সিলেটে করোনা সংক্রমণ বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে, রূপ নিয়েছে ভয়ঙ্কর। কঠোর বিধিনিষেধ দিয়েও সিলেটে ঠেকানো যাচ্ছেনা করোনা সংক্রমন। জুলাইয়ের শুরু থেকে প্রতিদিন কয়েক শতাধিক মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। প্রকোপ রুখতে লকডাউনের মধ্যেও গত কয়েকদিন থেকে থামছে না করোনায় মৃত্যু। সেই সাথে অতীতের মৃত্যু ও সংক্রমণ শনাক্তের সব রেকর্ড ভেঙেছে প্রাণঘাতি করোনা ভাইরাস। ভয়াবহ অবস্থা সন্নিকটে।

মৃতের সংখ্যা ও সংক্রমণের এই ঊর্ধ্বগতি থামাতে সরকার কঠোর লকডাউন আরোপ করেছে। কিন্তু অনেক মানুষই তা মানতে চাইছে না। নানা অজুহাতে ঘরের বাইরে চলে আসছে।

স্বাস্থ্যবিধি মানার ক্ষেত্রেও রয়েছে চরম উদাসীনতা।

কিন্তু কিছুদিন আগেও গ্রামের মানুষের মুখে মুখে একটাই কথা ছিল যে, গ্রামে করোনা নেই, আমাদের করোনা হবে না। করোনা কেবল শহরের মানুষের । এজন্য মুখে মাস্ক পরা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্যবিধি তাদের কাছে কেবল ‘হাসির খোরাক ছিলো। কিন্তু তাদের সকল ধারণা পাল্টে দিয়ে এখন শহর থেকে গ্রাম গ্রামান্তরেও বিস্তৃতি ঘটেছে করোনার। সময় যত গড়াচ্ছে পরিস্থিতি ততই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। কিন্তু এ ভয়াবহতার মাঝেও গ্রামের করোনা আক্রান্তরা থেকে যাচ্ছেন দৃষ্টির আড়ালে।

সর্বশেষ সিলেট বিভাগে করোনা আক্রান্ত হয়ে মাত্র একদিনের ব্যবধানে সিলেটে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ১৭জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে করোনা শনাক্ত হয়েছে আরও ৮০২জনের। যা সিলেটে একদিনে সর্বোচ্চ। এর আগে গত বুধবার সিলেটে ২৪ঘন্টায় করোনায় মারা গিয়েছিলেন ১৭জন।

 

শুক্রবার (৩০ জুলাই) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সিলেট বিভাগীয় পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় গণমাধ্যমকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

প্রতিবেদনে বলা হয় গত ২৪ ঘন্টায় শনাক্ত ৮০২ জন রোগীর মধ্যে ৪৬৪ জনই সিলেট জেলার বাসিন্দা। বাকিদের মধ্যে সুনামগঞ্জের ১২১ জন, হবিগঞ্জের ৫১ এবং ১৬৬ জন মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা রয়েছেন।

এনিয়ে সিলেট বিভাগে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৩৯ হাজার ১১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এদের মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ২৪ হাজার ৭২৮ জন, সুনামগঞ্জে ৪ হাজার ৫৭৩ জন, হবিগঞ্জে ৪ হাজার ৪৫১ জন ও মৌলভীবাজারে ৫ হাজার ৩৬৪ জন রয়েছেন।

সিলেট বিভাগে গত ২৪ ঘন্টায় ১ হাজার ৮৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। মোট টেস্টের ৪৩.৭৫ শতাংশই করোনা আক্রান্ত। এর মধ্যে সিলেট জেলায় ৫০.৬৬ শতাংশ, সুনামগঞ্জে ৩৪.৯৭ শতাংশ, হবিগঞ্জে ৩১.৬৮ শতাংশ এবং মৌলভীবাজারের ৪০.৪৯ শতাংশ।

একই সময়ে সিলেটে ৪১৩ জন রোগী সুস্থ হয়ে উঠেছেন। সুস্থদের মধ্যে ২৩৯ জনই সিলেট জেলার বাসিন্দা। বাকিদের মধ্যে সুনামগঞ্জ জেলার ৩২ জন, হবিগঞ্জ জেলার ৩৬ জন এবং ১০৬ জন মৌলভীবাজার জেলার বাসিন্দা।

বিভাগে এ পর্যন্ত ৩০ হাজার ৩২০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী সুস্থ হয়েছেন।

এর মধ্যে সিলেট জেলায় ২০ হাজার ৮৪১ জন, সুনামগঞ্জে ৩ হাজার ২৯৭ জন, হবিগঞ্জ জেলায় ২ হাজার ৪৯৩ জন ও মৌলভীবাজারে ৩ হাজার ৬৮৯ জন।

এদিকে, গত ২৪ ঘন্টায় মারা যাওয়া ১৭জনের মধ্যে সিলেট জেলার ১৪ জন এবং মৌলভীবাজার জেলার ৩ জন বাসিন্দা রয়েছেন।

এ নিয়ে সিলেট বিভাগে ৬৮৪ জন করোনাভারাইরাসে আক্রান্ত রোগী মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে সিলেট জেলায় সর্বোচ্চ ৫৪৬ জন, সুনামগঞ্জে ৪৯ জন, হবিগঞ্জে ৩০ জন এবং মৌলভীবাজার জেলায় ৫৯ জন রয়েছেন।

সিলেট বিভাগে নতুন করে ৭৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলার ৬৯ জন, সুনামগঞ্জ ২ এবং মৌলভীবাজার জেলার ৫ জন রয়েছেন।

এ পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত ৪০২ জন রোগী বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এর মধ্যে সিলেট জেলার বিভিন্ন হাসপাতালে ২৭৩ জন, সুনামগঞ্জের হাসপাতালে ৬৯ জন, হবিগঞ্জের হাসপাতালে ২৯ জন ও মৌলভীবাজারের হাসপাতালে ৩১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

 

বিভিন্ন সূত্র বলছে,

করোনা এখন শুধু শহরেই নয়, বিস্তার ঘটিয়েছে গ্রামাঞ্চলেও। তাই হাসপাতালে প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের হার, বাড়ছে রোগী ভর্তির সংখ্যাও। গত ২/৩ সপ্তাহে সিলেটের হাসপাতালে যত রোগী ভর্তি হয়েছেন তাদের বেশিরভাগ বিভিন্ন উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকার। তবে হাসপাতালে ভর্তি কিংবা আগতদের এ সংখ্যা খুবই নগন্য। করোনা আক্রান্তদের একটা বড় অংশ থেকে যাচ্ছে দৃষ্টির আড়ালে। তারা না করছে করোনা টেস্ট, না আসছে হাসপাতালে। জানাজানি হবে এই ভেবে করোনাক্রান্তরা ভয়ে নীরবে নিজ বাড়িতে চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে। এতে কোন নিয়ম কানুন মানছে না কেউ। গ্রাম্য হাতুড়ে চিকিৎসকরাই তাদের ভরসার কেন্দ্রস্থল।

স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঠেকানো যাচ্ছে না করোনা সংক্রমণের হার। কঠোর লকডাউনেও যদি এ অবস্থা হয়, তবে লকডাউন তুলে নিলে কি হবে তা সহজেই অনুমেয়। সিলেটের সরকারি- বেসরকারি হাসপাতালগুলো করোনা রোগীর সামলাতে চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে। আইসিইউ বেড নেই। সংকট সাধারণ বেডেরও। অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়ে কোনোমতে চলছে চিকিৎসা। হাসপাতালের দরোজায় দরোজায় রোগী নিয়ে ভিড় করছে স্বজনরা। কিন্তু এক্ষেত্রে চরম অসহায়ত্ব দায়িত্বরতদের।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আক্রান্তদের বড় অংশটি করোনা টেস্ট না করায় সংক্রমণ ঘটছে দ্রুত। আক্রান্তরা সাধারণ সময়ের মতো মিশছে সবার সাথে। উপসর্গ নিয়ে গ্রাম্য বাজারগুলোতে আড্ডা দিচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি কিংবা লকডাউন তাদের কাছে দূরের কোন কল্পনা। গ্রামের বিশাল অংশটি কোন নিয়ম কানুন না মানায় করোনা পরিস্থিতি দ্রুত ভয়াবহ হয়ে উঠছে। যা লকডাউন কিংবা শাটডাউন দিয়ে ঠেকানো যাবেনা। এজন্য সবার আগে প্রয়োজন গ্রামে গ্রামে ‘করোনা প্রতিরোধ কমিটি’ কার্যকর করা। এছাড়া আর কোন উপায় নেই।

সিলেটের দায়িত্বপ্রাপ্ত একজন কর্মকর্তা বলেন, করোনা আক্রান্ত রোগীরা অনেক দেরিতে হাসপাতালে আসছেন। আক্রান্ত হওয়ার একপর্যায়ে যখন দেখতে পাচ্ছেন-আর নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না তখন হাসপাতালে আসছেন। রোগীরা দেরি করে ফেলায় মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়ছে, বাড়ছে অন্যকে সংক্রমতি করার ঝুঁকিও। বর্তমানে করোনা রোগীর সংখ্যা যেভাবে বাড়ছে তাতে চিকিৎসা দিতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। এভাবে বাড়তে থাকলে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠবে। তখন সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে।

দেশে প্রথম করোনাভাইরাস শনাক্তের খবর জানানো হয় গত বছরের ৮ মার্চ। এর এক মাসের মাথায় ৮ এপ্রিল দেশে মোট রোগী ছিলেন ২১৮ জন। ওই সময় পর্যন্ত সংক্রমণ পাওয়া গিয়েছিল ২২ জেলায়। এরপর বিভিন্ন সময়ে সংক্রমণ কমবেশি হলেও গত প্রায় দুই মাস ধরে দেশে করোনা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে। করোনার ডেলটা ধরনের দাপটে দৈনিক সংক্রমণ ও মৃত্যু কয়েক গুণ বেড়েছে। সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আনতে চলতি মাসের প্রথম দুই সপ্তাহ দেশে সর্বাত্মক বিধিনিষেধ পালন করা হয়। এ সময় সব ধরনের অফিসের পাশাপাশি গণপরিবহন চলাচলও বন্ধ রাখা হয়। ২১ জুলাই ঈদুল আজহা উপলক্ষে এই বিধিনিষেধ আট দিনের জন্য শিথিল থাকার পর গত শুক্রবার থেকে আবার দুই সপ্তাহের লকডাউন শুরু হয়েছে।

ঈদের ছুটিতে লাখ লাখ মানুষের শহর থেকে গ্রামে যাওয়া এবং তাদের ফিরে আসায় সংক্রমণ বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছিলেন বিশেষজ্ঞরা। করোনা নিয়ন্ত্রণে গঠিত জাতীয় কারিগরি কমিটি ঈদ ঘিরে বিধিনিষেধ শিথিলের সরকারী সিদ্ধান্তে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছিল। ঈদের পরে করোনা রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হচ্ছে। তাতে বিশ্বে এখন দিনে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত ও মৃত্যু হচ্ছে যেসব দেশে, সেই তালিকায় বাংলাদেশ।






© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব SylhetLive24.Com কর্তৃক সংরক্ষিত ।

Design BY SYLHET-LIVE-24
ThemesBazar-Jowfhowo