শুক্রবার, ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০:৪৫ অপরাহ্ন

সিলেটে করোনা টেস্টে দুর্নীতি, সুমনের মাসিক আয় আড়াই লক্ষ টাকা

সিলেটে করোনা টেস্টে দুর্নীতি, সুমনের মাসিক আয় আড়াই লক্ষ টাকা

sylhetlive24.com
মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পাল। ইনসেটে- লাল বক্সে করোনা টেস্টের রশিদ।


বিশেষ প্রতিবেদক

সিলেটে করোনা নমুনা সংগ্রহে লাইন ছাড়া দুর্নীতি করে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ভিআইপি সেবা দিচ্ছে উপশহরস্থ সীমান্তিকের করোনা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র! এখানে ভিআইপি সেবা পেতে হলে তিন হাজার পাঁচশত পঞ্চান্ন টাকার করোনা টেষ্ট-ফি পরিবর্তে অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা করে দিতে হয়। অতিরিক্ত টাকা দিলে লাইনে দাড়াঁনোর জুট-ঝামেলা থেকে মিলে মুক্তি! সম্প্রতি করোনা টেস্টকে পুঁজি করে একজন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট দুর্নীতি করে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা আয় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানেন না। কর্তৃপক্ষের টনক নড়ে তখন, যখন টাকার বিনিময়ে তিন ভিআইপি রোগী পরীক্ষা করেও তাদের রিপোর্ট অনলাইনে না পাওয়ায় তারা পরদিন সীমান্তিকের করোনা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রে গিয়ে হুলুস্থুল শুরু করে। এ ঘটনায় প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে অতিরিক্ত টাকার বিনিময়ে ভিআইপি সেবা দেয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সুমন পাল। পেশায় একজন মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন আরবান প্রাইমারী হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস ডেলিভারী প্রজেক্ট এর বিনোদিনী নগর মাতৃসদন কেন্দ্রে কাজ করেন। মাতৃসদন কেন্দ্রে করার কথা থাকলেও সেখানে তিনি প্রক্সি দিয়ে কাজ করছেন সীমান্তিক প্যাথলজী ও ডায়গনষ্ঠিক সেন্টারের পিসিআর (কোভিড-১৯)-এর ল্যাবে।

ঘটনা ১১ই এপ্রিল রোববারের। উপশহরস্থ সীমান্তিকের করোণা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্র যান নগরীর কুমারপাড়ার বাসিন্দা জামিল আহমদ ও তার দুই বোন। করোনা পরীক্ষা করতে গিয়ে দেখেন রোগীদের দীর্ঘ লাইন। বিকল্প ব্যবস্থা করতে সেখানকার এক মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পালকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি তাদের বলেন, আজকে ৯৪ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হবে৷ জামিল আহমদের সিরিয়াল ৯৪ জনের পিছনে হওয়ায় তিনি কিছুটা চিন্তায় পড়েন। এ সময় টেকনোলজিষ্ট সুমন পাল তাকে আড়ালে নিয়ে বলেন, করোণা পরীক্ষা যদি জরুরী হয় তাহলে অন্য এক সিষ্টেমে তিনি পরীক্ষা করিয়ে দিতে পারবেন অথবা আগামীকাল এসে পরীক্ষা করাতে হবে। তবে এরজন্য জনপ্রতি অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা দিতে হবে। বিকল্প ব্যবস্থায় রাজি হন জামিল আহমদ। তিন হাজার পাঁচশত পঞ্চান্ন টাকার করোনা টেষ্ট ফি;র সাথে অতিরিক্ত দেড় হাজার টাকা করে মোট তিনজনের পনের হাজার একশত পয়শট্টি টাকা দেন জামিল আহমদ। লাইন ছাড়াই ভিআইপি সেবা দিয়ে টাকা জমাসহ নিজেই সাথে থেকে নমুনা সংগ্রহ করান তাদের মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পাল। ওই দিন রাত ১০টায় রিপোর্ট অনলাইনে প্রকাশ পাওয়ার কথা থাকলেও কোন রিপোর্ট না পেয়ে পরদিন ১২ এপ্রিল রিপোর্ট জানতে পুনরায় সীমান্তিকের করোণা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রে হাজির হন জামিল আহমদ।

তিনি সুমন পালকে খোঁজ করেন। তখন সেই অফিসের কর্মকর্তারা বলেন, সুমন পাল এসে চলে গেছে। পরে নমুনা পরীক্ষার রশিদ দেখিয়ে করোনার রিপোর্ট দেখতে চাইলে শুরু হয় তল্লাশী। আবেদন ফরম, নমুনা কিছুই খোঁজে পাওয়া যায়নি! কোনো কিছুরই মিল পাচ্ছেন না সেখানকার কর্মকর্তারা। এসময় সীমান্তিকের করোনা নমুনা সংগ্রহ কেন্দ্রের একজন ডাইরেক্টর হুমায়ুন কবীরের বিষয়টি দেখছেন বলে-রশিদের ফটোকপি রেখে ফিরিয়ে দেন ভোক্তভূগিদের। অপেক্ষার আরো একদিন পার হল, ফলাফল শুন্য। কোনভাবেই কোন কিছু মিলাতে পারছেন না কর্মকর্তারা। অথচ তারা জানতেন সেখানে কি হচ্ছে। এইভাবে অপেক্ষা চলতেই থাকে। এক পর্যায়ে এক প্রভাবশালী সাবেক ছাত্রলীগের নেতার ফোন আসে ভোক্তভূগির কাছে। তিনি বিষয়টি নিয়ে মুখ না খোলতে অনুরোধ জানান। তিনি বিষয়টি সমাধান করে দিবেন বলে আশ্বস্ত করেন তাদের। পরদিন তিনিও গায়েব। বিষয়টি ধামাচাপা এরকম অপেক্ষা গিয়ে ৯ দিন হল। কোনো খবর নেই!

অবশেষে ঘটনা নিয়ে মুখ খুলেন ভোক্তভূগিরা। কথা হয় আমাদের প্রতিবেদকের সাথে। এরই সূত্র ধরে শুরু হয় গোপন খবর সংগ্রহ। প্রতিবেদক বন্ধুত্ব করেন সীমান্তিকের অফিসের সেই মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পালের সাথে। বেরিয়ে আসে সব অজানা তথ্য। কিভাবে কি হয় এই করোনা টেষ্ট নিয়ে নানা রকম চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন তিনি। বন্ধুত্ব এখানেই সমাপ্তি।

প্রতিবেদক প্রতারণার ব্যাপারে জানতে মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পালকে ফোন করা হলে তিনি জানান, তিনি সীমান্তিক নামক কোনো প্রতিষ্ঠান চিনেন না। সীমান্তিকের সাথে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই। অথচ সীমান্তিকের নিয়মিত কর্মকর্তা তিনি। এর যথেষ্ট তথ্য প্রমানাদি রয়েছে আমাদের প্রতিবেদকের হাতে। তবুও তিনি স্বীকার করতে নারাজ।

বিষয়টি জানতে আরবানের প্রজেক্ট ম্যানেজার পারভেজ আলমের মুঠোফোনে কল করলে তিনি রিসিভ করেন নি।

এ ব্যাপারে সীমান্তিক সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও সিলেট জেলা যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম আহমদ বলেন, সুমন পাল তাদের একজন ষ্টাফ। তিনি ২০০০০-২৫০০০ টাকা বেতনে চাকুরী করছেন সীমান্তিকের করোনা পিসিআর ল্যাবে। অথচ বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন সুমন পাল! শামীম আহমদ আরো বলেন, আরবান এবং সীমান্তিক একই প্রজেক্ট। তিনি কোথায় কোন ষ্টাফকে ডিউটি করাবেন সেইটা তার ব্যাপার।

এই ব্যাপারে সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. জাহিদুল ইসলাম বলেন, সুমন পাল সিসিকের অন্তর্ভুক্ত আরবারের একজন ল্যাব টেকনোলজিষ্ট। তিনি সরকারী ল্যাব (আবুল মাল আব্দুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স) এর ল্যাবে প্রয়োজনে কাজ করার অনুমতি রয়েছে তবে সীমান্তিক সম্পূর্ণ প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান সেইখানে কাজ করার কোন অনুমতি নেই তার। তিনি আরো জানান, সিসিকের সাথে সীমান্তিকের কোন সংশ্লিষ্টতা নাই।

উল্লেখ্য, মেডিকেল টেকনোলজিষ্ট সুমন পাল বিনোদিনী থেকে মাসিক বেতন পান ১৪ হাজার টাকা এবং সীমান্তিক পিসিআর ল্যাব থেকে ২৫ হাজার টাকা। তাছাড়া প্রতি মাসে অবৈধভাবে করোনা টেষ্টে ভিআইপি সার্ভিসের নামে মানুষদের কাছ থেকে এবং বিদেশগামী গ্রাহকদের কাছ থেকে হাতিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে ইনকাম করেন তা প্রায় আড়াই লক্ষ টাকা। দূনীতি করে তিনি দুটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন।






© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব SylhetLive24.Com কর্তৃক সংরক্ষিত ।

Design BY SYLHET-LIVE-24
ThemesBazar-Jowfhowo