বুধবার, ০৬ Jul ২০২২, ১২:৩১ অপরাহ্ন

সিলেটের ছড়াগাঙ চা-বাগান দখল, সমুজ এখন মস্তবড় ‘রাজা’

সিলেটের ছড়াগাঙ চা-বাগান দখল, সমুজ এখন মস্তবড় ‘রাজা’

sylhetlive24.com/সিলেট লাইভ
ফাইল ছবি- সমুজ আলী।


বিশেষ প্রতিবেদক :: টিলার মাটি, চা-বাগানের গাছ আর প্লট করে জমি বেচা তার এক তুড়ির কাজ। বাগানে চাকরি জুটিয়েছেন গাড়িচালকের পদমর্যাদার। মাস গেলে মাইনে দুই হাজার ৮০০ টাকা। অনিয়মে জড়িয়ে এখন উঁচু-নিচু টিলা আর আঁকাবাঁকা রাস্তায় বীরদর্পে হাঁকান নিজের গাড়ি। সকালে জিপ, বিকেলে প্রাইভেটকার। তার ইশারা ছাড়া যেন চা বাগানের পাতা কিংবা কুঁড়ি- কিছুই নড়ে না! অপরাধের শিকড় শক্ত করতে গড়ে তুলেছেন নিজস্ব বাহিনী। তিনি সমুজ আলী। খাদিমপাড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। বাগানের এই চৌকিদারই এখন মস্তবড় ‘রাজা’। সিলেটের খাদিমপাড়ার ছড়াগাঙ চা বাগানে চলছে তারই ‘শাসন’। চা বাগান ছাড়াও পাশের বিশাল সরকারি জায়গাতেও আছে তার নিয়ন্ত্রণ।

চা বাগানের কর্মচারী সমুজ আলীর বিরুদ্ধে অভিযোগের ফিরিস্তি বেশ লম্বা। ওই বাগানে বাস করেন কয়েক হাজার মানুষ। তাদের দেখভালের দায়িত্বটাও নিজেই নিয়েছেন কৌশলে। ক্ষমতার দাপটে ইচ্ছা হলে জনবসতি উচ্ছেদ করেন, আবার ইচ্ছা হলে নতুন বসতি গড়ে দেন। অবৈধভাবে ঘর তুলতে ও জমি কেনাবেচায় তাকে দিতে হয় মোটা অঙ্কের টাকা। তার নামে রয়েছে হামলা-মামলা, চাঁদাবাজি, বালু বেচাকেনা, সরকারি কাজে বাধাসহ হরেক অপরাধের অভিযোগ।

স্থানীয় ছড়া থেকে সমুজ কয়েক বছর ধরে বালু উত্তোলন ও বিভিন্ন টিলার মাটি বিক্রি করে আসছেন। গত ২৭ জুন টিলা কেটে নিজের ট্রাকে মাটি পরিবহনের অভিযোগে পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ দেন উত্তর মোকামের গুলের বাছিদ মিয়া। একই বছরের ৬ জুন তার বিভিন্ন অপরাধ ও অনিয়ম বিষয়ে দুদক সিলেট অফিসেও তিনি অভিযোগ করেন। সমুজের এমন কর্মকাণ্ডে তেতে আছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা; সরাসরি কিছু না বললেও দারুণ নাখোশ বাগানের মালিকপক্ষও।

সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একসময় ফিনলে কোম্পানির কাছে ছিল বুরজান টি স্টেট। ছড়াগাঙ চা বাগানটি ছিল বুরজানের আওতায়। স্বাধীনতার পর ওই বাগানের ইজারা নেন জাসদ নেতা অধ্যাপক মো. শফিক চৌধুরী। এখন বাগানটির দায়িত্বে আছেন তার ভাই প্রবাসী রফিক চৌধুরী। বাগানের বাইরে জেলা প্রশাসনের মালিকানাধীন ১৪৪ একর জমি রয়েছে। ১০ বছর আগেও সেখানে বাস করতেন ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষ। এখন সেখানে ৮ থেকে ১০ হাজার লোকের বাস। ২০১৪ সালে বাগানের কর্মচারী হিসেবে চাকরি নেন সমুজ আলী। স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রভাবশালী দেখে মূলত সমুজকে বাগান কর্তৃপক্ষ চাকরি দিয়েছিল। বাগানের নাম ভাঙিয়ে এসব অপরাধ করলেও বাগান কর্তৃপক্ষ নীরব। অভিযোগ রয়েছে, বাগানের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ রয়েছে সমুজের অপকর্মে। তবে এ ব্যাপারে বাগান ব্যবস্থাপক সবুর খান কোনো কথা বলতে রাজি হননি।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, সমুজের বাহিনীতে রয়েছেন দুলাল, লতিফ, ইসলাম, মন্তাজ, ভাই এরশাদ, আমরোজসহ কয়েকজন। যারা তার নানা অপরাধে ভূমিকা রাখে।

স্থানীয়রা জানান, উত্তর মোকামের গুলের বাসিন্দা কলন্দর আলীর ছেলে সমুজ আলীর পরিবারের আগে ‘নুন আনতে পান্তা ফুরাত’। বাগানে চাকরি নেওয়ার পর ওই এলাকার প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় সমুজ। এলাকার লোকজন তাকে বাগানের ‘চৌকিদার’ হিসেবেই চেনে। তবে সমুজ চা বাগানের কর্মচারী হিসেবে চাকরি করছেন বলে নিশ্চিত করেছেন সেখানকার এক কর্মকর্তা।

ছড়াগাঙ চা বাগান ঘুরে দেখা যায়, চারদিকে টিলা আর সমতল ভূমির পাশাপাশি রয়েছে চা গাছের বিশালতা। উত্তর মোকামের গুল, টিকরপাড়া, হিলঠাকুরের মোকাম, কুশিরগুল, উত্তর পীরের চক ও ভুমরা গোংরা গ্রাম ঘিরে যেন আলাদা এক ‘রাজ্য’। সিলেটের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা দরিদ্র ও অসহায় লোকই সেখানকার টিলা ও সমতল ভূমিতে বাস করছেন। তবে সমুজ ও তার বাহিনীর লোকদের কথার বাইরে যাওয়ার সাধ্য কারও নেই। উত্তর মোকামের গুলের বাসিন্দা আবদুল বাছিদ জানান, সমুজের অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় তাকে একঘরে করে রাখার চেষ্টা হয়েছে। গত বছরের ১৩ জানুয়ারি তাকেসহ তিনজনকে রাস্তায় বেঁধে রেখে পুলিশে দেওয়া হয়েছে। সেই মামলায় তিনি পরে মুক্তি পান।

ফিরোজ আলী নামে সমুজের এক আত্মীয় কঠোর সমালোচনা করে বলেন, ‘এলাকার সবকিছুর নিয়ন্ত্রক সমুজ আলী। তার নির্দেশ ছাড়া সেখানে কিছু হয় না। বাগানের নাম ভাঙিয়ে নানা অন্যায় ও অবৈধ কাজ করেন। এখানকার বাসিন্দাদের জিম্মি রেখেছেন।’

এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আফসার উদ্দিন বলেন, সমুজের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ নেই, যা আসেনি। একাধিকবার তার বিরুদ্ধে সালিশও হয়েছে। তার কাছে এলাকার মানুষ জিম্মি।

ছড়াগাঙ চা বাগানের কর্মকর্তা কামরুজ্জামান বলেন, ‘এক হাজার ৮০০ একর জায়গাজুড়ে এই বাগান। এর বাইরে বাগানের আরও হাজার একর জায়গা রয়েছে। অনেক জায়গা বেদখল। সমুজ আমাদের স্টাফ। গাড়িচালকের স্কেলে বেতন পান। তিনি বিভিন্ন বিষয় দেখাশোনা করেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি পুরো সত্য নয়।’

নিজেকে বাগানের গাড়ির স্টাফ দাবি করে সমুজ আলী সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার জন্মের আগ থেকে সেখানে লোকজন বাস করছে। আমি কি বাগানের মালিক যে তাদের নিয়ন্ত্রণ করব। কারা কীভাবে জায়গা বেচাকেনা করে, আমি জানি না।’ টিলা কাটা ও প্লট বিক্রির ব্যাপারে তিনি বলেন, ‘একটি পক্ষ আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার করছে। আমি কারও কাছ থেকে টাকা নিইনি।’

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার (গণমাধ্যম) বি এম আশরাফ উল্যাহ তাহের জানান, সমুজের বিষয়টি তিনি খোঁজ নেবেন। সরকারি কিংবা বাগানের জায়গা- যা-ই হোক না কেন, বসবাসের বৈধতা থাকতে হবে। তাদের জিম্মি করা যাবে না।

সূত্র : মুকিত রহমানী, সমকাল






© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব SylhetLive24.Com কর্তৃক সংরক্ষিত ।

Design BY Web Nest BD
ThemesBazar-Jowfhowo