মঙ্গলবার, ০৫ Jul ২০২২, ০৪:০০ অপরাহ্ন

সিলেটের ইতিহাসে ভয়াবহ বন্যা : পানিবন্দী মানুষের বাঁচার আকুতি

সিলেটের ইতিহাসে ভয়াবহ বন্যা : পানিবন্দী মানুষের বাঁচার আকুতি

sylhetlive24/সিলেট লাইভ


নিজস্ব প্রতিবেদক

তিন হাজার টাকায় নৌকা ভাড়া করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে কোনো-মতে সিলেট শহরে এসে পৌঁছেছেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার জমির হোসেন। আশ্রয় নিয়েছেন নগরীর একটি আবাসিক হোটেলে। জমির হোসেন বলেন, উপজেলার উত্তর রণিখাই গ্রামের বাড়িতে ঘরে এখন ৭ ফুট পানি। এরই মধ্যে ভবনের উপরে আশ্রয়ে ছিলেন, সেখান থেকে নৌকা করে সালুটিকরে এসে পৌঁছান। তার মতো হাজার হাজার পানিবন্দী মানুষ এখন এলাকা ছাড়ার অপেক্ষায়। স্ত্রী সন্তান নিয়ে জমির হোসেন প্রাণে বাঁচলেও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার লাখো মানুষ রয়েছেন পানিবন্দি। বন্যায় গ্রাস করছে উপজেলার সব এলাকা। কোনো বাড়িই রক্ষা পাচ্ছে না বন্যার কবল থেকে। অনাহারে থাকা লোকজন এখন কেবল প্রাণে বাঁচতে চান। কিন্তু একটি নৌকা মেলানো তাদের কাছে এখন সোনার হরিণ।

এমন ভয়ানক বন্যা ৫০ বছর বয়সে আর দেখেননি জমির হোসেন। তিনি বলেন, উপজেলার প্রায় শতভাগ মানুষ পানিবন্দি। কেউ ত্রাণ চায় না, প্রাণে বাঁচতে চায়। তাছাড়া গত ৪দিন ধরে বিদ্যুৎহীন থাকায় মোবাইলফোনে যোগাযোগ বন্ধ। ফলে উদ্ধারে সহায়তা চাওয়ার সুযোগ নেই। এজন্য মানুষকে খোঁজে-খোঁজে উদ্ধারে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের কাছে মিনতি জানান তিনি।

 

উপজেলার স্থানীয় বাসিন্দা আবুল হোসেন বলেন-

ভয়াবহ বন্যায় গ্রাস করছে একের পর এক এলাকা। মানুষ এখন ত্রাণ চায় না, প্রাণ বাঁচাতে চায়। কিন্তু হাওরে আফাল (ঢেউ) চলছে। ছোট নৌকা করে এখান থেকে পারাপার বেশি ঝুঁকি, ডুবে যেতে পারে। ফলে অনেকে পানিবন্দি অবস্থায় আটকে রয়েছেন। পানি বাড়তে থাকায় উদ্ধারের আর্তনাদে রয়েছেন মানুষজন। তাই মানুষজনকে উদ্ধারে বড় নৌকা নিয়ে যাওয়া দরকার।

 

মানুষ টাকা দিয়েও একটি নৌকা ব্যবস্থা করতে পারছেন না-

স্থানীয় সূত্র জানায়, মানুষ টাকা দিয়ে একটি নৌকা ব্যবস্থা করতে পারছেন না। ফলে উদ্ধারের আর্তনাদ সবখানে। কে-কাকে উদ্ধার করবে, এমন দৃশ্য চোখে দেখে বরদাস্ত করার নয়।

একই অবস্থা সিলেটের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর, কানাইঘাট, সিলেট সদর উপজেলাতে। এছাড়া সিলেটের ১৩টি উপজেলায় নতুন-নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। ফলে আশ্রয়ের সন্ধানে রযেছেন মানুষজন।

 

যুক্তরাজ্য প্রবাসী গোয়াইনঘাট এলাকার বাসিন্দা অধ্যাপক নুরুজ্জামান মনি-

তিনি বলেন, ১৯৮৮ সালের বন্যায়ও আমার বাড়ির উঠোনে পানি উঠেছিল। কিন্তু এবার ঘরেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। তাঁর ৬৬ বছর বয়সে এ ধরণের প্লাবন কখনো দেখেননি। আমাদের বাড়ি অনেকটা উঁচু স্থানে। তাই বাড়িতে কয়েক পরিবার আশ্রয় নিয়েছিলেন। এখন আমার বাড়ির লোকজনই আশ্রয়ের খোঁজে অন্যত্র যেতে হচ্ছে। তিনি অতিদ্রুত সিলেট অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

শুক্রবার দুপুর থেকে সেনাবাহিনী নেমেছে উদ্ধার তৎপরতায়। বন্যার্তদের উদ্ধারে এবং সিলেট বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র সচল রাখতে সেনাবাহিনীর সদস্যরা কাজ করছে।

 

জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়-

‘ইন এইড টু সিভিল পাওয়ার’- এর আওতায় ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১২ এর ধারা ৩০ মোতাবেক বেসামরিক প্রশাসনকে প্রয়োজনীয় সহায়তা করতে সিলেট বিভাগের (সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলা) বিভিন্ন উপজেলায় সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। বন্যা কবলিত প্রান্তিক এলাকায় পানিবন্দী লোকদের উদ্ধারসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় মানবিক কার্যক্রম সেনাবাহিনীর সহযোগিতায় স্থানীয় প্রশাসন ইতোমধ্যে শুরু করেছে।

 

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে-ভারি বর্ষণ ও উজানের পাহাড়ি ঢলে সিলেটে সব নদ নদীর পানি বেড়েই চলেছে। নদীগুলোর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপৎসীমার উপর দিয়ে প্রবাহমান রয়েছে। বিকেল ৩টার হিসাব অনুযায়ী, সুরমার পানি কানাইঘাটে ১২৮ সেন্টিমিটার, সিলেটে সুরমার পানি ৭৭ সেন্টিমিটার, সারি নদীতে ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এছাড়া কুশিয়ারার বিভিন্ন পয়েন্টেও নদীর পানি বিপৎসীমা ছুঁই ছুঁই করছে।

গত রাত থেকে সিলেটে মোষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। এতে জনজীবন বিপর্যন্ত হয়ে পড়েছে। বন্যাকবলিত এলাকার লোকজন গবাদিপশু নিয়ে আশ্রয়ের খোঁজে কেবল শহরের দিকে আসছেন। কিন্তু নগর এলাকারও প্রায় অর্ধেকাংশ বন্যার পানিতে নিমজ্জিত। এ অবস্থায়ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে নৌকা যোগে ও পায়ে হেঁটে উদ্ধার কাজ চালাচ্ছেন।






© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব SylhetLive24.Com কর্তৃক সংরক্ষিত ।

Design BY Web Nest BD
ThemesBazar-Jowfhowo