বুধবার, ০৬ Jul ২০২২, ০২:১১ অপরাহ্ন

চোরাকারবারি আরিফ চক্রের বিচার কার্যক্রম শুরু, অভিযোগপত্রে বিস্তর বর্ণনা

চোরাকারবারি আরিফ চক্রের বিচার কার্যক্রম শুরু, অভিযোগপত্রে বিস্তর বর্ণনা

sylhetlive24/সিলেট লাইভ


বিশেষ প্রতিবেদক

সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরের সৈয়দপুরের বাসিন্দা বর্তমান নগরীর সিলভ্যালি টাওয়ারের ফ্ল্যাট নং- B-12 এর সৈয়দ আরিফ আহমদ (৩৬) দীর্ঘদিন ধরে মোবাইল চোরাচালানের সাথে সম্পৃক্ত। সীমান্তের ওপার থেকে শুল্ক ফাঁকি দিয়ে নিয়ে আসতেন ভারতের তৈরি মোবাইলের চালান। নিজের গাড়িতে করেই বিশ্বস্ত লোকদের মাধ্যমে নিয়ে আসা চালান নগরীর বিভিন্ন মোবাইল মার্কেটে পৌঁছেও দিতেন। পুলিশের দেয়া অভিযোগপত্রে আরিফ সম্পর্কে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রায় ৪২ লাখ টাকা মূল্যের তার একটি চোরাচালান আটক করেছিল পুলিশ।

সিলেট মহানগর দায়রা জজ আব্দুর রহিমের আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

সিলেট মহানগর দায়রা জজ আদালতের পিপি এডভোকেট নওশাদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন, এটি একটি আলোচিত ঘটনা। মোবাইল চোরাচালানের মামলাটি বিশেষ ক্ষমতা আইনের।

আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বহুল আলোচিত মোবাইল চোরাচালানের মামলাটি বিচার কার্যক্রমের জন্যে ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর বিচারিক আদালত থেকে সিলেটের মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর হয়ে আসে। এরপর থেকে মহানগর দায়রা জজ আদালতে মামলাটির (বিশেষ ক্ষমতা মামলা নং-৪৯/২০২০) কার্যক্রম চলছিল।

করোনা মহামারি ও লকডাউনের ফলে দীর্ঘদিন আদালতের কার্যক্রম বন্ধ থাকায় বিচার শুরু করা যায়নি। ইতোপূর্বে সৈয়দ আরিফ আহমদ এই মামলা থেকে অব্যাহতি পেতে একটি আবেদন করেন। অভিযোগ গঠনে রাষ্ট্রপক্ষ প্রস্তুত রয়েছে বলে পিপি এডভোকেট নওশাদ আহমদ চৌধুরী জানিয়েছেন।

সূত্র জানায়, দেশে প্রথমবারের মতো শুরু হওয়া কঠোর লকডাউনের মধ্যেই ২০২০ সালের ৩১ মার্চ আদালতে মামলার অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্তকারী কর্মকর্তা। অভিযোগপত্র নং-১৪২/২০২০। অভিযোগপত্রে জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুরের (আগুনকোনা) বাসিন্দা সৈয়দ তৈমুছ আলীর পুত্র সৈয়দ আরিফ আহমদ (৩৬), দোয়ারাবাজার উপজেলার পেকপাড়ার (মোকামছড়া) মৃত সিরাজুল ইসলামের পুত্র আকলাকুল ইসলাম মৃদুল (৩৬) ও জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুরের (আগুনকোনা) মৃত আব্দুল মজিদের পুত্র জিলু মিয়াকে (২৯) আসামি করা হয়।

অভিযোগপত্রে সৈয়দ আরিফের চোরাচালানি সম্পর্কে বিস্তর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। চোরাচালানে নিজের সম্পৃক্ততা, চোরাচালান নিয়ে আসতে কৌশল অবলম্বনের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়।

তদন্তকালে এজাহারভুক্ত আসামি আকলাকুল ইসলাম মৃদুলকে গ্রেফতার করা হয়। মৃদুল আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।

জবানবন্দিতে মৃদুল বলেছে, ‘১৬ নভেম্বর ২০১৯ তারিখ বিকেল বেলা আরিফ সাহেবের গাড়ি চালক জিল্লুর আমাকে ফোন দিয়ে বলে একটা ট্রিপ পাইছি যাবা নাকি? আমি তার সাথে যেতে রাজি হই। আমরা সালুটিকর বাজারে একটা ট্রিপে যাই। সালুটিকর যাওয়ার পরে একটা সিএনজিতে করে নিয়ে আসা ৩ কার্টন মাল একজন সিএনজি ড্রাইভার আমাদের বুঝিয়ে দেয়। সিএনজি ড্রাইভারের নাম জানি না-অনটেস্ট সিএনজি ছিল। ওই ড্রাইভার আমাদের একটা ফোন নম্বর দেয়-কাগজে লেখা ছিল। সে বলেছিল ওই নম্বরে ফোন দিয়ে মালগুলো দিতে হবে। ঘাসিটুলার আবুল নামের একজন ওই ট্রিপটা নিয়ে যেতে বলে। আমরা মাল নিয়ে আসার পথে একটা এক্সিও গাড়ি এবং একটা মোটরসাইকেল চৌকিদেখী থেকে আমাদের গাড়িকে ধাওয়া করে। তখন পীরমহল্লা-হাউজিং এস্টেট হয়ে সাগরদীঘির পাড়ে আসার সময় আমাদের গাড়ি একটা সিএনজিকে ধাক্কা দেয়। পরে লোকজন দলা (জড়ো) হয়ে গেলে আমি জিল্লুরকে গাড়ি থামাতে বলি। জিল্লুর বলে আবুল ভাই দেখবেন এইসব। আমরা চল মাল পৌঁছে দেই। আমি তখন গাড়ি থেকে নেমে পালিয়ে আমার বাসায় চলে আসি। পরে শুনেছি ঐ সিএনজিকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে থানা থেকে আমাদের ব্যবহৃত এক্সিও গাড়িটা ছাড়িয়ে নিয়ে গেছে।

আমরা পালিয়ে যাওয়ার পরে সেই সাদা প্রাইভেটকার এবং মোটরসাইকেল যারা আমাদের ধাওয়া করতেছিল। তারা মাল নিয়ে গেছে। মোটরসাইকেলের লোক পুলিশ ছিল।

আমি সৈয়দ আরিফ আহমদের গাড়ি চালাই। তার বাড়ি শামীমাবাদ এলাকায় খান সেন্টারে। আরিফ সাহেবের বউকে এয়ারপোর্টে নামিয়ে দিয়ে আমি এবং জিল্লুর ঐ মাল আনার ট্রিপে যাই’।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, ‘ঘটনার তারিখ ও সময় আসামি আকলাকুল ইসলাম মৃদুল, সৈয়দ আরিফ আহমদ এর স্ত্রীকে এয়ারপোর্ট নামিয়ে দিয়ে গাড়ি চালক আকলাকুল ইসলাম মৃদুল ও জিল্লুর মিয়াদ্বয় সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থানাধীন সালুটিকর এলাকায় যায় এবং ভারত হতে চোরাচালানের মাধ্যমে আনয়নকৃত ২৭৯টি এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট ভর্তি ৩টি কার্টন গাড়ির পিছনে ব্যাক ঢালার ভিতর রাখিয়া আসামি জিলু মিয়া করোলা এক্সিও গাড়ি চালাইয়া আসিতেছিল।

আসামি সৈয়দ আরিফ আহমদ এর ব্যবহৃত নম্বরের সিডিআর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সৈয়দ আরিফ ঘটনার সময়ে ঘটনাস্থলের আশপাশের এলাকায় অবস্থান করছিল। আকলাকুল ইসলাম মৃদুল ও জিলু মিয়ার সাথে একাধিকবার যোগাযোগ করে তাদের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য নেয়।

সৈয়দ আরিফ আহমদ দীর্ঘদিন যাবত ভারত হইতে চোরাচালানের মাধ্যমে তার মালিকানাধীন করোলা এক্সিও গাড়ি চালক আকলাকুল ইসলাম মৃদুল ও জিলু মিয়ার মাধ্যমে গোয়াইনঘাট থানার সীমান্তবর্তী এলাকা হতে বাংলাদেশে এনে সিলেট শহরের বিভিন্ন মোবাইল মার্কেটে বিক্রয় করে আসছিল।

শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির ২৭৯টি এন্ড্রয়েড মোবাইল সেট যার আনুমানিক মূল্য ৪১ লাখ ৮৫ হাজার টাকা -নিয়ে আসে মর্মে প্রতীয়মান হয়’।

এদিকে, সৈয়দ আরিফ আহমদের এই বিশাল চোরাচালান আরেকটি ছিনতাইকারী চক্র জোরপূর্বক ছিনিয়ে নিয়ে যায়। নগর পুলিশের এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেনের নেতৃত্বে ছিনতাইকারীরা পুরো চালানটি নিয়ে গিয়েছিল। ঘটনা জানাজানির পরে অভিযান চালিয়ে জাহাঙ্গীরসহ এই চক্রের সকলকে পুলিশ গ্রেফতার করে। নগরীর একাধিক জায়গায় অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়েছিল পুরো চালান। বরখাস্ত করা হয় এএসআই জাহাঙ্গীর হোসেনকে।

পুরো ঘটনায় সোবহানীঘাট পুলিশ ফাঁড়ির তৎকালীন ইনচার্জ এসআই অনুপ কুমার চৌধুরী বাদী হয়ে পৃথক মামলা দায়ের করেন। চোরাচালানের ঘটনায় বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় আরিফ ও মৃদুলের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতনামা ৪/৫ জনকে আসামি করা হয়েছিল।

ছিনতাইয়ের ঘটনায় জাহাঙ্গীর হোসেন, মোশাররফ হোসেন খান, ফারুক মিয়া, জহিরুল ইসলাম সোহাগের নাম উল্লেখ করে আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইনে মামলা দায়ের করা হয়।

সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে ওই চোরাচালানটি ছিল সবচেয়ে বড়। চোরাচালানটি ছিনতাই হওয়ার পরই সৈয়দ আরিফের নাম আলোচনায় আসে। এরপর তার খোঁজে মাঠে নামে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

সূত্র জানায়, একসময় জগন্নাথপুরের সৈয়দপুর বাজারে সাধারণ একজন মোবাইল মেকানিক ছিলেন আরিফ। কেবলমাত্র মোবাইল চোরাচালানের মাধ্যমে আরিফ হয়ে উঠেন বিপুল সম্পদের মালিক। নগরীর ইলেকট্রনিকস মার্কেট করিম উল্লায় নিজের মোবাইলের দোকানের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে সৈয়দ আরিফ মোবাইলের চোরাচালান চালিয়ে আসছিলেন।

আরিফ জগন্নাথপুর থেকে যখন সিলেটে পাড়ি জমায় তখন তার পরিচয় হয় জৈন্তা দরবস্তের মোবাইল চোরাকারবারি নুরুজ্জামান ও সিদ্দিকের সাথে। এরপর আর তাকে পিছু তাকাতে হয়নি। শুরু হয় মোবাইল চোরাচালান।

এখন আরিফের সিলেটের করিমউল্লাহ মার্কেটে দুটি দোকান, মিলেনিয়াম মার্কেটে রয়েছে দুটি মোবাইলের শোরুম। আরিফ এখন চোরাচালান মোবাইল সিন্ডিকেটের প্রধান। টাকার গরমে এখন সে সখ্যতা গড়ে তুলেছে প্রশাসন ও সরকার দলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাথে। বর্তমানে সিলেটের বাজারে আরিফের চোরাচালানকৃত মোবাইলের সয়লাব।

সূত্র জানিয়েছে, গেলো ৪ মাস আগে আরিফ ভারতে গিয়ে চোরাকারবারিদের সাথে সাক্ষাৎ করে আসে। সীমান্তবর্তী এলাকার জৈন্তা দরবস্তের চোরাইমাল ব্যবসায়ী নুরজ্জামানের কাছ থেকেই ৭০০ মোবাইল সেট কিনে আনেন আরিফ। এছাড়াও নুরজ্জামানকে একটি এলিয়ন কারও উপহার হিসেবে দেন আরিফ। যার নং- ঢাকা মেট্রো- ল – ৪৭-০১২১। কেবল ভারতীয় সেট সিলেটে নিয়ে আসা-ই নয়, সিলেট তথা বাংলাদেশে চুরি-ছিনতাই হওয়া মোবাইল সেটের চালানও তাদের মাধ্যমে ভারতের চোরাচালানীদের নিকট পৌঁছে দেন।






© এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা বা ছবি অনুমতি ছাড়া নকল করা বা অন্য কোথাও প্রকাশ করা সম্পূর্ণ বেআইনি। সর্বস্বত্ব SylhetLive24.Com কর্তৃক সংরক্ষিত ।

Design BY Web Nest BD
ThemesBazar-Jowfhowo